চট্টগ্রামের বোয়ালখালীতে গৃহ শিক্ষকের সঙ্গে পরকীয়া সম্পর্ক থাকার সন্দেহে হালিমা খাতুন নামে দুই সন্তানের জননীকে মারধর, শ্লীলতাহানি ও তার ইচ্ছার বিরুদ্ধে জোরপূর্বক সাক্ষর নিয়ে তালাকনামা সম্পাদনের অভিযোগ ওঠে।
অভিযুক্তরা হলেন স্ত্রী হালিমা খাতুনের স্বামী কাউছার আলম ও স্থানীয় নিকাহ রেজিস্ট্রেশনকারী মোঃ কামাল উদ্দীন ওরফে কাজী কামাল। এ ঘটনায় হালিমা খাতুন বাদী হয়ে অভিযুক্ত দু’জনের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করেন। যা আদালতে সি আর মামলা নং ৫৩৯/২৪ (বোয়ালখালী) হিসেবে চলমান রয়েছে।
এই মামলায় টাকার বিনিময়ে আসামিদের পক্ষে মামলার তদন্ত রিপোর্ট দেওয়ার অভিযোগ তুলেন চট্টগ্রামের বোয়ালখালী থানার সাব-ইন্সপেক্টর(নিরস্ত্র) মোঃ মাঈন উদ্দিন ভূঁইয়ার বিরুদ্ধে ভুক্তভোগী হালিমা খাতুন ও তার পরিবার। জানা যায়, চট্টগ্রাম আদালতে মামলা দায়েরের পর ওই পুলিশ কর্মকর্তার কাছে মামলার বাদীপক্ষ দারস্থ হলে তাদের কাছ থেকে ৫ হাজার টাকা নেন এই পুলিশ কর্মকর্তা। পরে বাদীকে মামলাটির তদন্ত ও খরচ বাবদ মোটা অংকের অর্থ দাবী করেন তিনি,মোটা অংকের টাকা দিতে রাজী না হলে পরের দিন ৫ হাজার টাকা বাদীকে ফেরত হিসেবে টাকা বুঝিয়ে দেন এ পুলিশ কর্মকর্তা। পরে আসামিদের কাছ থেকে অত্র এলাকার হারুন এর মাধ্যমে ১৩ ও ১৫ হাজার করে মোট ২৮ হাজার টাকা নিয়ে আসামিদের পক্ষে মামলার প্রতিবেদন দাখিল করেন বলে অভিযোগ তুলেন ভুক্তভোগী ও তার পরিবার।
চলতি বছরের ২২ অক্টোবর উপজেলার পৌরসভায় পশ্চিম গোমদন্ডী ঘোড়ার বাড়ী এলাকাতে স্থানীয় গৃহ শিক্ষকের সঙ্গে পরকীয়া সম্পর্ক থাকার সন্দেহের জেরে স্ত্রীকে পাড়া-প্রতিবেশিদের সামনে এলোপাতাড়ি মারধর করে জখম , শ্লীলতাহানি ও কাজীর সহায়তায় ধারালো অস্ত্রের মুখে জিম্মি করে জোরপূর্বক হলফ ও তালাকনামায় সাক্ষর নেয়ার চাঞ্চল্যকর এমন ঘটনা ঘটে।
মানবাধিকার কর্মীরা মনে করেন, তাদের ১১ বছরের সংসার জীবনে এমন বিচ্ছেদের ঘটনায় এক কন্যা ও পুত্র সন্তানের ভবিষ্যৎ জীবনে প্রভাব পড়বে,যা পারিবারিক ও সামাজিক জীবনে মোটেও কাম্য নয়।
অভিযোগ সূত্রে জানা যায়, ভুক্তভোগী হালিমা খাতুন ও অভিযুক্ত কাউছার আলমের সাথে বিগত ২০১৩ সালের ৭ জুন পাঁচ লক্ষ টাকা দেন মোহরে পারিবারিক ও সামাজিকভাবে রেজিস্ট্রার্ড কামিন নামা মূলে বিয়ে হয়। ভুক্তভোগী স্বামীর সংসারে সুশৃঙ্খল ও শান্তিপ্রিয় হয়ে বসবাস করে আসছে। তাদের সংসারে একটি ১০ বছরের কন্যা ও ৭ বছের একটি পুত্র সন্তান রয়েছে।
বিয়ের কয়েক মাস পর থেকে অভিযুক্ত স্বামী সন্দেহবাতিক হয়ে সাংসারিক তুচ্ছ বিষয় নিয়েও তুমুল অশান্তি সৃষ্টি করতে থাকে। ভুক্তভোগী সন্তানদের মুখের দিকে তাকিয়ে এ স্বামীর শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন মুখ বুজে সহ্য করে নিতেন।
কিন্তু এতেও ক্ষান্ত হননি স্বামী কাউছার আলম। সে উদ্দেশ্যপ্রণোদিত হয়ে ঘটনার ২-৩ মাস আগে পূর্ব পরিকল্পিতভাবে সন্তানদের জন্য প্রাইভেট টিউটর হিসেবে বেলাল নামে স্থানীয় এক শিক্ষককে ঠিক করে। তাকে নিয়েও পরকীয়া সম্পর্ক থাকা সন্দেহ পোষণের জেরে স্ত্রী হালিমা খাতুনকে শারিরীক ও মানসিকভাবে নির্যাতন করতে থাকে।
এরই প্রেক্ষিতে ভুক্তভোগী বহুবার গৃহ শিক্ষকের প্রয়োজন নেই বলে স্বামীকে বারণ করলেও সে প্রতিবেশীদের কানাঘুষায় ও অসৎ উদ্দেশ্য হাসিলের লক্ষ্যে গৃহ শিক্ষককে রেখে দেয়।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, ঘটনার দিন পরিকল্পিতভাবে কাউছার আলম এ চাঞ্চল্যকর ঘটনা ঘটায়। প্রাইভেট টিউটর যখন অন্য দিনের ন্যায় সেদিন বিকালে সন্তানদের পড়াতে বসে, অভিযুক্ত কাউছার আলম ও কাজী কামালসহ আরো ভাড়াটে ৬-৭ কিশোর গ্যাং সদস্য নিয়ে অতর্কিতভাবে বাড়িতে ঢুকে শিক্ষক বেলালের শার্টের কলার ধরে টেনেহিঁচড়ে কিল,ঘুষি মারতে থাকে।
ভয়ভীতি দেখিয়ে তার কাছ থেকে মিথ্যা অনৈতিক সম্পের্কর স্বীকারোক্তি নিয়ে নেয়। তার শোর চিৎকারে ভুক্তভোগী হালিমা খাতুন বাড়ির উঠান থেকে প্রতিবাদ করতে আসলে স্বামী কাউছার আলম তাকে কিল,ঘুষি ও লাথি মারতে মারতে ব্লেড দিয়ে গায়ের জামা ছিড়ে শ্লীলতাহানি,লাঠি দিয়ে শরীরের বিভিন্ন অংশে জখম ও বাম চোখে আঘাত করে।আরো জানা যায়, অভিযুক্ত কাউছার আলম পাড়া-প্রতিবেশীদের সামনে অশ্লীল গালাগাল করে তালাক দিবে চিল্লাতে থাকে।
ভুক্তভোগী এরও প্রতিবাদ করলে তাকে ধারালো অস্ত্রের মুখে জিম্মি করে কাজী কামালের সহায়তায় একশ টাকা মূল্যের তিনটি নন-জুডিসিয়াল খালি স্ট্যাম্পে মিথ্যা অবৈধ কুকর্মের অনুতপ্ত সরূপ হলম নামায় ও বালাম বের করে ইচ্ছের বিরুদ্ধে জোরপূর্বক স্বাক্ষর নিয়ে তালাকের ফর্ম সম্পাদন করে।
একই সাথে পৃহ শিক্ষকের সাথে পরকীয়া সম্পর্ক আছে বলে মিথ্যা স্বীকারোক্তির ভিডিও ধারণ করে। পরবর্তীতে ভুক্তভোগীকে সামাজিকভাবে হেয়প্রতিপন্ন করে অসুস্থ অবস্থায় বাপের বাড়িতে পাঠিয়ে দেহ।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, স্বামী পরিকল্পিতভাবে আর্থিকভাবে লাভবান হওয়ার ইচ্ছায় ও দ্বিতীয় বিবাহ করার উদ্দেশ্যে গৃহ শিক্ষককে ব্যবহার করে মিথ্যা অপবাদের নাটক সাজিয়ে নিজের স্ত্রীর শ্লীলতাহানি করে তার ইচ্ছের বিরুদ্ধে জোরপূর্বক খালি স্ট্যাম্পে ও তালাক নামায় স্বাক্ষর নিয়েছে।’
তার এ কাজে আর্থিকভাবে লাভবান হয়ে সহযোগিতা করেছেন স্থানীয় কাজী মোঃ কামাল উদ্দীন, সালিস কারক হারুন, শুক্কুরসহ আরো অনেকে। কাজী কামাল সংশ্লিষ্ট থানায় প্রভাব বিস্তার করে তাদের পক্ষে তদন্ত প্রতিবেদন প্রস্তুত করে নেয়।
এ বিষয়ে অভিযুক্ত কাউছার আলম বলেন, :শিক্ষক বেলালের সঙ্গে আমার স্ত্রীর পরকীয়া ও অনৈতিক সম্পের্কর কথা তার দু’জনই স্বীকার করেন। মামলায় আমার বিরুদ্ধে যা অভিযোগ আনা হয়েছে তা মিথা ও বানোয়াট। তবে রাগের মাথায় তালাক দেয়াটা আমার ঠিক হয়নি। সন্তানদের দিকে তাকিয়ে আমি এখনো হালিমা খাতুনকে নিয়ে সংসার করতে রাজি আছি।’
এদিকে অভিযুক্ত কাজী কামাল উদ্দীন ও শিক্ষক বেলালের সাথে এলাধিকবার ফোনে যোগাযোগ করেও তাদেরকে পাওয়া যায়নি।
এবিষয়ে জানতে চাইলে বোয়ালখালী থানার সাব-ইন্সপেক্টর(নিরস্ত্র) মোঃ মাঈন উদ্দিন ভূঁইয়া বলেন, আমি মামলার সুষ্ঠ তদন্ত করেছি, এখানে বাদীর কোনো আপত্তি থাকলে আদালতে এ বিষয়ে আপিল করবে। এখানে টাকা নেওয়া বা টাকা চাওয়ার যে বিষয়টি নিয়ে যে কথা উঠেছে সেটি সত্য নয়।
Leave a Reply